Let's spread some positivity
ভারতীয় উপমহাদেশের মাস অডিয়েন্স সাধারণত সিনেমায় ওভার মেলোড্রামা, একশন, কমিডি সহ মোটামুটি একটা এন্টারটেইনমেন্ট প্যাকেজ না হলে সেটাকে সিনেমা বলতে নারাজ হয়ে যায়। এবং দ্বিতীয়ত তারা মনে করেন যে কোনো সিনেমার পেছনে পুরো কৃতিত্ব সেই সিনেমার নায়কের। যার কারনে তারা কার সিনেমা বলতে সম্বোধন করে 'অমুক নায়কের সিনেমা'। কিন্তু না, সিনেমা অলওয়েজ ডিরেক্টর মিডিয়ামস। একটা সিনেমা ভালো কিংবা খারাপ হওয়ার সম্পূর্ণ ক্রেডিট যাবে সেই সিনেমার পরিচালকের উপর। সিনেমাটা সেই ডিরেক্টরের ভিশন। এরপর অভিনেতা কিংবা টেকনিক্যাল টিম সেই সিনেমার সৌন্দর্য বর্ধন করে তাদের গুণ দিয়ে।
কিছুদিন আগে সন্দিপ রায় ঘোষণা দিলেন তিনি ফেলুদার নতুন সিনেমা হত্যাপুরী নির্মান করবেন। সবার মধ্যে এক ধরনের আনন্দের পাশাপাশি উত্তেজনা সৃষ্টি হলো যে এবার নতুন ফেলুদা কে হবেন!
সন্দিপ রায় জানালেন তিনি ফেলুদা হিসেবে নিতে চান ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তকে। কিন্তু কমেন্ট বক্সে আবিরের ভক্তরা চায় আবির ফেলুদা হোক, টোটার ভক্তরা চায় টোটা ফেলুদা হোক। আর এদিকে প্রডাকশন হাউজ থেকে সাজেস্ট করা হলো অনির্বাণ ভট্টাচার্য্যকে ফেলুদা করা হোক। কিন্তু সন্দিপ রায় আর সিদ্ধান্তে স্থির। এর রেষারেষিতে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হলো হত্যাপুরীর কাজ। এই ঘটনায় আসলে কে সঠিক ছিলেন? আবির ও টোটা তো অলরেডি ফেলুদায় অভিনয় করে নিজেদের প্রমান করেছেন। অনির্বান তো রীতিমতো জাদরেল অভিনেতা। এই তিনজন থেকে নিশ্চই ইন্দ্রনীল খুব বড় মাপের অভিনেতা নয়। তাহলে তার মধ্যে সন্দিপ রায় এমন কি দেখলেন যে তাকে নিতে পারেননি বলে সে সিনেমাটাই আর করলেন না!
কারন এখানে ডিরেক্টরের স্বাধীনতা হরন করা হয়েছে। কারন প্রডাকশন হাউজের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সাধ্য নেই একজনের ডিরেকটরের সিদ্ধান্ত হরন করা।
এবার আসি এতো কথা বলার পেছনে আসল উদ্যেশ্যে। আমাদের দেশে বর্তমানের আলোচনার শীর্ষে রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত আসন্ন চলচ্চিত্র মুজিব। দেশের একশ্রেণির মতে সিনেমার কাস্টিং সঠিক হয়নি৷ বিশেষ করে তারা মুজিব চরিত্রে আরিফিন শুভকে মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু তারা জানেন না যে শুভ এই চরিত্রটা হুজুগে পায়নি। রীতিমতো চারবার অডিশন দিয়ে তারপর তাকে এই চরিত্রে সিলেক্ট করা হয়েছে। এবং তিনি একা এই চরিত্রের জন্য অডিশন দিয়েছেন এমন নয়, ইন্ডাস্ট্রির ম্যাক্সিমাম অভিনেতারা অডিশন দিয়েছেন। অনেকেই দেখলাম বলছেন এই চরিত্রের জন্য আহমেদ রুবেল, চঞ্চল চৌধুরী কিংবা তারিক আনাম ঠিক সঠিক ছিলো। আপনাদের জানিয়ে রাখি চঞ্চল চৌধুরী এবং তারিক আনাম খান ও অডিশন দিয়েছিলেন। নিশ্চই পরিচালক তাদের মধ্যে সেই এক্স ফ্যাক্টর দেখতে পাননি যেটা শুভর মধ্যে পেয়েছেন। আর বাকি থাকলো আহমেদ রুবেল। তিনি তো অলরেডি 'চিরঞ্জিব মুজিব' নামে একটা সিনেমায় নাম ভুমিকায় অভিনয় করেছেন। এবং ট্রাস্ট মি তার অভিনয় পুরো কাঠ। এবং তাকে দেখতে এতোটাই বৃদ্ধ লেগেছে যে সয়ং মুজিবুর রহমান মৃত্যুদশাতেও ওতোটা বৃদ্ধ ছিলেন না।
লোকের আরেকটি অভিযোগ শুভকে যে মেকাপ করানো হয়েছে তাতে তাকে পুরোপুরি মুজিব মনে হচ্ছে না।
আচ্ছা এম.এস ধোনি কার কার পছন্দের সিনেমা? আপনি যখন ধোনির বায়োপিক দেখছিলেন, কখনো কি আপনার মনে হয়েছে যে সুশান্ত সিং রাজপুতকে প্রস্থেটিক লাগিয়ে ধোনির মতো চেহারা বানানো উচিৎ ছিলো, কিংবা তার ভয়েস মড্যুলেশন করে বা কোনো পাতলা কন্ঠস্বরীকে দিয়ে ডাবিং করানো উচিৎ ছিলো? করেছেন কি? করেন নি।
সুপার থার্টি সিনেমায় হৃত্তিকের মেকাপ কি রিয়েল লাইফের আনন্দ কুমারের মতো ছিলো? মেকাপ দূরে থাক সে যে এক্সেন্টে কথা বলছিলো সেটা পর্যন্ত মিল ছিলো না। অথচ হৃত্তিক তার এক্সেন্টের জন্যই বেশি প্রশংসা পেয়েছিলো।
কারন সিনেমা আপনাকে মেক বিলিভ করতে শেখায়। কিছুক্ষনের জন্য এই বাস্তব দুনিয়ে থেকে আপনাকে ট্রান্সপোর্ট করে সিনেমা তার নিজের দুনিয়ায় নিয়ে যায়। কারন সিনেম্যাটিক ওয়ার্ল্ডে ১০০% বাস্তবসম্মত সব পাবেন না। আর সেই জন্যেই আমরা বাহুবালি, কেজিএফ, ত্রিপল আর বা পুষ্পার মতো আনরিয়েলিস্টিক সিনেমাগুলোও এঞ্জয় করি।
এবার আরেক শ্রেণির প্রসঙ্গে আসি যারা বলছেন মুজিব চরিত্রে অভিনয় করার জন্য রিয়েল লাইফে তার আদর্শ অনুসরণ প্রয়োজন। তা নাহলে সে মুজিবকে ধারন করতে পারবে না। এর চাইতে থার্ডক্লাস যুক্তি আমি জীবনে কোনোদিন শুনিনি। এদের ভাষ্যমতে হিটলারের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য তাকে হিটলারের মতানুসারী হওয়া লাগবে। হিন্দিতে অত্যান্ত জনপ্রিয় একটি টিভি সিরিজ মহাভারত, সেই সিরিজের অর্জুন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন একজন মুসলিম নাম শাহের শেখ। এখন কি তার বাস্তব জীবনে অর্জুন হতে হবে?
কিছুদিন আগে সৌমিত্র চট্টপাধ্যায় এর বায়োপিক রিলিজ হয়েছে। এবং বায়োপিকে সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন কিউ (কৌশিক মুখার্জি)। জেনে অবাক হবেন বাস্তব জীবনে তিনি সত্যজিত রায়ের একজন কট্টর সমালোচক।
কথায় আছে ভালো সমালোচকের বৈশিষ্ট্য হলো তিনি প্রথমে তিনি প্রথমে ইতিবাচক দিক তুলে ধরবেন। কিন্তু মুজিব নিয়ে যে আলোচনা সমালোচনা চলছে তা দেখে মনেই হচ্ছে না যে এই টিজারে ইতিবাচক কিছু ছিলো। আসলেই কি ছিলো না?
প্রথম দৃশ্য যেখানে শুভ দু হাত উচু করে আগাচ্ছে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে ভয়েজ ওভার চলছে 'আমি বাঙালী, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। একবার মরে দুইবার মরেনা'। এটা টিজারের একমাত্র গুজবাম্প সিন। মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ চরিত্রে কে অভিনয় করেছেন জানিনা, (সম্ভবত ভারতের কেউ হবেন) তবে তাকে দেখতে ও ডায়লগ ডেলিভারি দারুন লেগেছে। টিজারে দেখানো বঙ্গবন্ধুর মুখে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই শুনে অনেকেই অবাক হচ্ছেন ও ঐসময়ে সে জেলে ছিলেন। আসলে এই দৃশ্যটা ২০ বা ২১ শে ফেব্রুয়ারীর নয়, এটা ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চের দৃশ্য। খন্দকার মোস্তাক চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু ও আব্দুল হামিদ খান ভাসানির চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আজাদকে জীবন্ত মনে হচ্ছে। তৌকির আহমেদকে হোসেন সোহরাওয়ার্দী ও রিয়াজকে তাজউদ্দীন আহমেদ হিসেবে ঠিকঠাক লাগছে। কিন্তু বলিউড অভিনেতা রজিত কাপুরকে দুটি দৃশ্যে দেখা গিয়েছে, কেউ যদি জানেন উনি কার চরিত্রে অভিনয় করছেন তাহলে প্লিজ কমেন্ট বক্সে জানাবেন।
এছাড়া অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা ইংরেজিতে দিয়েছিলেন। তো আপনারা যদি দৃশ্যটা ঠিক করে দেখেন সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু মুখে বাংলা বলছেন কিন্তু তার পাশে মোরশেদ লিখছে (হয়তো তিনি ইংরেজিতে লিখেছিলেন)।
একটা দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে কিছু ছেলে বন্দুক কাধে হেটে যাচ্ছে এবং তাদের পেছনে পূর্ব বাংলার পতাকা। এখানে একটু খেয়াল না করেই সবাই সমালোচনা করছে যে পতাকায় বাংলাদেশের মানচিত্র না দিয়ে তারা ভুল করেছে। কিন্তু একটু রেজুলেশন বাড়িয়ে যদি দেখেন তাহলে আবছা হলুদ রঙ চোখে পড়বে। এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ ভারত ভাই ভাই। যেটি বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ভাষনে বলেছিলেন।
আমরা এতো অতি আবেগি যে নিজেরা ইতিহাস সম্পর্কে কতটুকু জানি সে প্রশ্ন থাকা স্বত্ত্বেও ইতিহাসের ভুল ধরে নিজেরা ভুল করেও পান্ডিত্য দেখাচ্ছি। আমার লেখার প্রথম প্যারাতেই লিখেছি একটা সিনেমার ক্যাপ্টেন অফ দ্যা শিপ হলো সেই সিনেমার পরিচালক। তার নির্দেশেই অভিনেতারা অভিনয় করে। কোনো অভিনেতাই নিজের থেকে কোনো ডায়লগ বলেনা। কিন্তু এই টিজার মুক্তির পর থেকে শুভর পেছনে মানুষ যেভাবে লেগেছ, যেভাবে স্যোসাল মিডিয়ায় তাকে ট্রল করা হচ্ছে, যেভাবে তার পোস্টের কমেন্ট বক্সে বুলিং করা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে শুভ নিজ উদ্যেগে এই সিনেমা বানিয়েছে, নিজেই যেন ডায়লগ লিখেছে। অথচ এই চরিত্রটা পাবার পর চাইলেই মোটা অংকের টাকা দাবি করতে পারতো, তা না করে এই সিনেমাকে তার ড্রিম প্রজেক্ট ভেবে পারিশ্রমিক গ্রহন করেননি। চরিত্রটার পেছনে সময় দিয়েছেন দুই বছরের ও বেশি। এর ভেতরে অন্য কোনো সিনেমায় সাইন ও করেননি। অথচ আমরা তার ত্যাগের পেছনেও স্বার্থ খুজে বেড়াচ্ছি।
কথায় আছে 'হাতি কাদায় পড়লে চামচিকাও এসে লাথি মারে'। দেখা যাচ্ছে দর্শকদের অতি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের লোকেরাও ছাই পড়া আগুনে ফু দিচ্ছে। এই টিজার নিয়ে সুষ্ঠ সমালোচনা কম, ব্যক্তিগত আক্রোশ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বেশি দেখানো হচ্ছে।
পরিশেষে তাহসানের বলা কথাটা দিয়েই শেষ করি।
'আমাদের সমাজে নেতিবাচকতার ছড়াছড়ি আছে কিন্তু ইতিবাচকতা চর্চা করতে হবে'।
