প্রবাসী বর দেশে ফেরার পর থেকে বউ আলাদা বাড়িতে থাকতে চায় স্বামীকে নিয়ে৷ এটা নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে হাজার তর্ক বিতর্ক শেষেও কোন কূল কিনারা পাচ্ছে না।
কেন আলাদা বাড়িতে থাকবে বউ? সেটা জিজ্ঞেস করলে, একটা কথাই বলে৷ আমি সবার সাথে একঘরে থাকব না। আলাদা ঘর চাই।
শাশুড়ীর মাথায় হাত। ৩ বছর হলো ছেলে বিয়ে দিয়েছে। বউ এসেই ঘরে ভাঙনের সুর ধরালো। ব্যাপারটা যেন মোটেও মেনে নিতে পারছেন না। শাশুড়ী আছেন শ্বশুর জীবিত নেই। স্বামী সহ তিন ভাই আর এক বোন তারা। বোনের বিয়ে হয়েছে চার বছর হলো।
ঘরের বউ স্বামী নিয়ে আলাদা থাকতে চায়। শাশুড়ি যদি থাকে তাহলে শুধু মাত্র শাশুড়ি ই থাকবে বাকিরা না। বউয়ের এমন কথায় মেজাজ খারাপ জামিলের।
জামিলের বাবা বেশ অনেক বছর আগেই মারা যান৷ তখন জামিল আর তার ভাইবোনরা বেশ ছোট।
অভাবের সংসারে অনেক কষ্টে ছেলেমেয়ে বড় করেছেন মা।
এখন কিছুটা ভালো অবস্থায় যাওয়ার পর যদি বউয়ের কথা পরিবার থেকে আলাদা হয়। তাহলে মায়ের চেয়ে আর বেশি কষ্ট কেউ পাবে না।
সারা জীবনই তো মা কষ্ট করলেন। ছেলে হয়ে কি আবার কষ্ট দিবে এই বয়সে!
না, জামিল আর ভাবতে পারছিল না। বউকেও এই একটা বিষয় ছাড়া বলার মত কিছু নেই। সব দিক দিয়ে রিমা বেশ ভালো৷ জামিলের মা নিজেই এই কথা বলেছেন অনেকবার। তবে রিমার আজ এমন কথা কেন?
তাই জামিল আমার কাছে এসেছে সমাধান চাইতে৷ আমি বেশ বড়সড় না হোক৷ ছোটখাট একটা এনজিও চালাই। এলাকার টুকিটাকি কাজ করি৷ জামিলের সাথে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক তাই ওর নিজের কথাগুলো আমাকে শেয়ার করেছে।
জামিলের কথা শুনে আমার একেবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায় নেই। অবশ্যই রিমার সাথেও আমার কথা বলতে হবে৷ জামিলের কথা শেষে ওকে বললাম৷ আমি রিমার সাথে কথা বলতে চাই! যদি তোমার আপত্তি না থাকে৷ সমাধান করার আগে কারণটা খুঁজে বের করতে হবে।
জামিল বললো কাল নিয়ে আসবে রিমাকে।
পরদিন বেশ সকাল সকালই তারা দুজন হাজির৷ আপাদমস্তক বোরকা পরিহিতা রিমা৷
দুজনের সাথে কুশল বিনিময় করে করে জামিলকে বললাম, আমি রিমা আপুর সাথে একা কথা বলতে চাই। প্রথমে চুপ থাকলেও পরে সম্মতি দিল।
রিমাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে বেশ কনজারভেটিভ পরিবারের মেয়ে। সবকিছু গুছালো। যথেষ্ট সুন্দরী হবে সেটা আন্দাজ করা যায়।
রিমাকে বললাম, দেখো আপু। জীবনে অনেক রকম সমস্যা আছে৷ যা মুখ ফুটে বলতে হয়। নাহলে সমাধান হয় না। আর সমাধান চুপ থেকেও হয় না।
কোন মানুষের সাথে সারাজীবন কাটাতে হলে তাকে বিশ্বাস করতে হয়। নিজের যা আছে তা শেয়ার করতে হয়৷ নাহলে বিবাহিত জীবনের মানে হয় না৷ বয়সে আমার ছোট হলেও রিমাকে আপু বলে সম্মোধন করলাম আমি৷
অনেক কিছুর উদাহরণ দিলাম। অবশেষে রিমা আমাকে বলতে রাজি হলো।
কিছুটা ইতস্ততভাবে ভাবে শুরু করলো। দেখেন ভাইজান, আমি খুবই গরীব ঘরের মেয়ে। বিয়ে করে এমন ঘরে এসেছি এটাই অনেক ভাগ্য বলা যায়। মা বাবা কেউ বেঁচে নেই আমার৷ পড়ালেখাও তেমন করিনি৷
বাপের ভিটায় ভাই আর ভাইয়ের বউরা আছে৷ সেই ঘরে জামাইয়ের ঘর ফেরত বোনের জায়গা হয়ত হবে না কখনো৷ মেয়ে বিয়ে দিলেই পর হয়ে যায় এটা সত্য।
খুশির কারণ হয়ে গেলে বাপের বাড়ি ১০/১৫ দিন বড়জোর একমাস আদর পাওয়া যায় এরবেশি না।
আর আমি আমার স্বামীকে খুবই ভালোবাসি। তাকে ছাড়া থাকতে পারব না। যদিও মানুষটা রগচটা। পরিবারের কথা বেশি শুনে আমার কথার চেয়ে । বাইরের মানুষের কথায় মনোযোগী৷ সে যেমন আমি মেনে নিয়েছি কারণ মানুষ সব দিক দিয়ে ভালো হয় না ঘাটতি থাকে। সেও আমাকে ভালোবাসে৷ আমার যে সমস্যা সেটা কাউকে বললে উল্টো আমাকেই সবাই দোষারোপ করবে।
এমনিতেই আশেপাশে লোকেরা বলে জামাই বিদেশ থাকলে বউরা বিপথে চলে যায়। এটাই স্বভাব।
বিশ্বাস করেন ভাইজান। সব সময় যে বউদেরই দোষ থাকবে এমন তো না৷ হিতের বিপরীতেও কিছু হয়৷
আমার দেবর আমার সাথে খারাপ আচরণ করে। প্রথম দিকে যখন আচরণ খারাপ লাগা শুরু হয়। আমি এড়িয়ে চলতাম। চা নাস্তা আমি সবসময় নিজে গিয়ে দিয়ে আসতে চাইতাম না। মা মানে শাশুড়ীকে দিয়ে পাঠাতাম। সেটা নিয়েও আমাকে কথা শোনায় অনেক। উনি বিদেশ যাওয়ার পর,
হুট করে যখন তখন আমার রুমে চলে আসত। এমনকি আমি ঘুমিয়ে থাকলে পাশে গা ঘেষে বসার চেষ্টা করত। এরকম প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু ঘটতে শুরু হলো৷ যা আমার মোটেও ভালো লাগছিল না।
একবার আমার স্বামীর নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি৷ ফেরার সময় আমার শাশুড়িকে একটা কাজে মামারা থাকতে বললেন। আমি আমার ননাস বাকিরা চলে এলাম৷ সেদিন আমার ননাস আমাদের এখানেই থাকার কথা ছিল। রাতে হুট করে দুলাভাইয়ের শরীর খারাপের ফোন আসায় চলে যেতে হয়।
আপা চলে যাওয়ার পর আমার কেমন জানি ভয় লাগা শুরু করে। সেই রাতে আমার ভয়টা সত্যিতে রুপান্তর হয়। আমার দেবর জোরজবরদস্তি শুরু করে আমার সাথে৷ গ্রামের এক ঘর আরেক ঘর থেকে বেশ দূরে দূরে। আমি কাউকে ডাকতেও পারলাম না।
একটানা সব কথা বলে চোখ থেকে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়ল রিমার।
প্রচন্ড খারাপ লাগা শুরু হলো আমার। শাশুড়িকে অনেক বার বলার চেষ্টা করেছি। উল্টো আমাকে কথা শুনতে হয়েছে। আমার চালচলন খারাপ। যদিও পুরোটা বলার সুযোগ হয়নি৷ ঘরে আমার দেবর ফেরেশতা তূল্য। এরপর প্রতিরাতে বিছানার নিচে দা নিয়ে ঘুমাতাম। আরও একদিন এরকম করার চেষ্টা করলে দা দিয়ে হাতের একটা আঙুলে কুপ দিয়ে অর্ধেক কেটে ফেলি। নিজেকে রক্ষা করতে। সবার কাছে বলেছে কাজ থেকে ফেরার পথে এক্সিডেন্টে এমনটা হয়েছে।
রিমার এই ঘটনা শুনে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম৷ পুরো শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল আমার। মেয়েটার সাহস আছে তবে সেটা সব জায়গায় প্রয়োগ করতে পারে না।
স্বামীকে বলব! সে ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মত পবিত্র এমটা ধারণা রাখে। ভাই অল্প হলেও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে। তার ভাই এমন কিছু করবে সেটা মানতেই পারে না৷ আমি কোন দিকেই যেন কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না।
আমিও পারতাম দেবর সাথে সম্মতি দিয়ে আড়ালে পাপ করতে। কিন্তু সবাই তো এক না। চরিত্র তো সবার এক না?
প্রবাসীর বউরা এমন করলেও সব বউরা তো খারাপ না৷ ২/১ জন হলেও তো ভালো আছে। না হলে দুনিয়া টিকে আছে কি করে? বলেন! খারাপ যেমন আছে৷ ভালোও তেমন আছে৷ তাই আমার স্বামী আসার পর আলাদা থাকার জন্য জোরাজুরি শুরু করি।
এখন যদি ওকে বলে এসব! ঘরে শালিস বসবে। লোকজন আমাকেই দোষ দিবে অথচ আমার কোন দোষই নেই। তাহলে কেন আমি সব দোষ মাথা পেতে নিব! এরপর এসব শুনে আমার স্বামী কি আমাকে আগের মত ভালোবাসবে! বলেন!
আমি ভাবছিলাম, আসলে এই সমস্যাটা আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মফস্বল এলাকায় অহরহ ঘটছে। কিন্তু তুলে ধরার মত কোন সুযোগ নেই। পড়ালেখা কম জানা মেয়েরা মুখ বুজে সংসার করছে কোন পথ খোলা নেই দেখে।
আসলে সমস্যা উভয় দিকেই আছে। স্বামী ভরণ পোষন দিলেই স্বামীর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। স্ত্রীর মন বুঝাটাও অনেক বড় ব্যাপার!
আমি রিমাকে একটা আইডিয়া দিয়ে বললাম, দেখো তো ব্যাপারটা কাজ করে কিনা!
রিমা ও জামিল চলে গেল। বেশ ১০/১৫ দিন পরে একটা দাওয়াত আসলো! জামিলের ভাইয়ের বিয়ের দাওয়াত। উপহার নিয়ে যথা সময়ে উপস্থিত হলাম। রিমা জামিল খুব হাসি মুখেই আপ্যায়ন করলো আমাকে।
জামিলও বেশ খুশি৷ আর এই সমস্যা নিয়ে কথাও বলেনি৷
দেবরের বিয়ের পর সে তার বউকে নিয়ে শহরে চলে যায়। শহরে ছোটখাট একটা চাকরি করে। তাদের টুনাটুনির সংসার হয়ত ভালোই চলছে।
জামিল বিদেশ চলে গেছে কদিন হলো। কোনরকম স্বচ্ছলতা নিয়ে বেশ গুছিয়ে সংসার করছে রিমা। এই দেশের মেয়েরা এমনই৷ একটু পেলেই সেটা নিয়ে সারাজীবন আকঁড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চায়।
এনজিও এর কাজে বেশ দেরি হয়ে গেছিল আজ।
বাড়ি ফেরার পথে দুজন মহিলা একজন বোরখা পরিহিতা আর একজন নরমাল ড্রেস পরা মেয়ে আমাকে দেখে থেমে গেল।
বোরখা পরিহিতাকে চিনতে সময় লাগল না আমার!
সামনে গিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করতেই বললো,
ভাইজান আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করলাম নাকি বলেন তো!!
আমার দেবর রায়হান বউ থাকা সত্ত্বেও বউয়ের বোনের সাথে অবৈধ সম্পর্ক করেছে। বউকে মেরে কি হাল করেছে দেখেন!
ছলছল চোখে বললো, বিয়ে করলেই চরিত্র শুধরায় না ভাইজান।
(বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে লেখা। এরকম ঘটনা আশেপাশে অনেক ঘটতেছে এখন।)
চরিত্র
ফাবিহা ফেরদৌস