আওরঙ্গজেব - দ্য ম্যান অ্যান্ড দ্য মিথ
মুঘল বাদশাহদের মধ্যে একজন যিনি জনমানসে নিজ স্থান করতে বিফল হয়েছেন তিনিই হলেন বাদশাহ আওরঙ্গজেব। সাধারণ মানুষেরা মনে করেন আওরঙ্গজেব হিন্দুদের ঘৃণা করতেন, তিনি ধার্মিক উন্মাদ এবং কট্টরপন্থী শাসক ছিলেন, তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য নিজ বড়ো ভাই দারা শিকোকেও ছাড়েননি। এমনকি নিজের বৃদ্ধ পিতার শেষ সাড়ে সাত বছর আগ্রার কেল্লায় কয়েদী বানিয়ে রেখেছিলেন।
আওরঙ্গজেবের জন্ম 3 রা নভেম্বর, 1618 সালে গুজরাতের দাহোদে তাঁর দাদু বাদশাহ জাহাঙ্গীরের শাসনকালে হয়েছিল। তিনি শাহজাহানের তৃতীয় সন্তান ছিলেন। শাহজাহানের চার জন পুত্র ছিলেন, তাঁদের মা-এর নাম ছিল মুমতাজ। আওরঙ্গজেব ইসলামিক ধার্মিক সাহিত্যের পান্ডিত্য অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তুর্কি সাহিত্যেও পান্ডিত্য অর্জন করেন। তাছাড়া তিনি হস্তলিপি বিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন। যে যুগে ভারতে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের রাজত্ব ছিল সেই যুগে বিশ্বের GDP এর 1/4 অংশ ভারতেই উৎপন্ন হতো। আর্থিক ভাবে ভারতের স্তর তখন তেমন ছিল যেমন বর্তমানে আমেরিকার আছে।
আওরঙ্গজেবের শাসনকালে রাষ্ট্রের সীমান্ত কাবুল থেকে ঢাকা পর্যন্ত এবং কাশ্মীর থেকে পন্ডিচেরী পর্যন্ত 40 লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত ছিল। শুধু এটুকুই নয়, আওরঙ্গজেবের সেনা দক্কনের সুলতান, আফগান আর মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে করে এমন সুকৌশলি এবং দক্ষ হয়ে গিয়েছিল যে সেই সেনা বাহিনী বিশ্বের যেকোনো সেনা বাহিনীর সঙ্গে টক্কর রাখার ক্ষমতা রেখেছিল।
দিল্লীর সেনার কথা ছেড়ে দিন, শুধু বাংলার সুবেদার শাইস্তা খানের অধীনে 40 হাজারের বেশী সেনা ছিল। মুঘল সেনাবাহিনীর মোট সংখ্যা 9 লক্ষের বেশী ছিল। আর সেই সেনাবাহিনীর মধ্যে ভারতীয়, আরবীয়, আফগানী, ইরানী, এবং ইউরোপীয়রা ছিলেন।
অনেক কম সংখ্যক মানুষ জানেন, সিরাজুদ্দৌলা এবং টিপু সুলতানের সঙ্গে যুদ্ধ করার পূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলমগীরের সঙ্গে যুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে যায়, আর ইংরেজ দূতদের হাত বেঁধে বাদশাহর সামনে হাজির করা হয়। তারা দরবারের মাটিতে শুয়ে বাদশাহর কাছে ক্ষমা স্বীকার করতে বাধ্য হোন।
আমেরিকান ঐতিহাসিক ওড্রি ট্রস্কে তাঁর পুস্তক 'আওরঙ্গজেব- দ্য ম্যান অ্যান্ড দ্য মিথ' -এ লিখেছেন - "আওরঙ্গজেব হিন্দুদের ঘৃণা করতেন বলে মন্দির ধ্বংস করেছিলেন এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা।
আসলে আওরঙ্গজেবের এই চরিত্র বিকৃতির পিছনে ইংরেজদের যুগের ঐতিহাসিকেরা রয়েছেন। তারা খাদ্য ফেলো আর রাজত্ব করো নীতির অনুসরণ করে হিন্দু-মুসলিম বৈষম্যকে বৃদ্ধির করতেন। যদি আওরঙ্গজেবের শাসনকাল 20 বছর কম হতো তবে আধুনিক ঐতিহাসিকেরা তাঁর চরিত্র অন্যভাবে আকোলন করতেন।
আওরঙ্গজেব প্রায় 15 কোটি নাগরিকের রাষ্ট্রে 49 বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের এতো উন্নতি হয়েছিল যে উপমহাদেশকে তিনি নিজ সাম্রাজ্যের অংশ বানিয়ে নিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক ট্রস্কে আরোও লিখেছেন - আওরঙ্গজেব হাজার হাজার হিন্দুদের মন্দির ভেঙ্গেছিলেন এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। কিছু মন্দির তাঁর আদেশে ভাঙ্গা হয়েছিল, যেমন মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছিল। আর এগুলো ভাঙ্গার আদেশ দানের পিছনে যথেষ্ট কারণ ছিল। আওরঙ্গজেবের শাসনকালে হিন্দুদের নরসংহারের মতো কোনও ঘটনাই ঘটেনি। বাস্তবে আওরঙ্গজেবের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহু হিন্দু ব্যক্তি ছিলেন।"
Omar Faruk Biswas✍✍✍
